Kaspersky APAC

বাংলার খেলাধুলা

প্রাচীন কাল থেকে বাঙালির বিনোদনের অন্যতম উৎস ছিল খেলাধুলা। গ্রাম বাংলায় প্রচলিত খেলাধুলা কখনো একক ভাবে আবার এখনো কয়েকটি গ্রাম নিয়ে অনুষ্ঠিত হতো। বাঙালির ইতিহাস ঐতিহ্যের অন্যতম একটি উপাদান হচ্ছে এদেশের গ্রাম বাংলার চির চারিত খেলাধুলা। শত শত বছর ধরে  গ্রামীণ সংস্কৃতির ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখছে খেলাধুলা গুলো। বাংলার গ্রাম গুলোতে এখনো প্রচলিত আছে কাবাডি, দাড়িয়াবান্ধা, গোল্লাছুট, বৌচি, কানামাছি এর মত খেলাধুলা গুলো।

বাংলাদেশসহ ভারত উপমহাদেশে এসব খেলাধুলা গুলো ছিল সমান জনপ্রিয়। ক্রিকেট, ফুটবল, হকি এর মত খেলা গুলো বাংলাদেশ ভারতে জনপ্রিয় হলেও গ্রামীণ খেলাধুলার জন্য  বাঙালির অন্যরকম আবেগ কাজ করে। গ্রামীণ ঐতিহ্য সংস্কৃতির বাহক সেই খেলাধুলা গুলো এখন আগের মত চর্চা হয় না। আবার নতুন প্রজন্মের অনেকেই আছে যারা এই খেলাধুলা গুলোর নামও শুনেনি। নতুন প্রজন্মকে গ্রামীণ ঐতিহ্যের সেই খেলা গুলোর সাথে পরিচয় করিয়ে দিতেই “দেশের মাটির” এর এই ক্ষুদ্র প্রয়াস। 

১. পুতুল খেলা

পুতুল খেলা বাঙালি গ্রামীণ ঐতিহ্যকে লালন করে আসছে যুগ যুগ ধরে। মাটিতে দিয়ে বানানো বিভিন্ন পুতুলকে সাজিয়ে এই খেলাটি হয়। পুতুল গুলোকে কাপড় ও গয়না দিয়ে সাজিয়ে একে অপরের সাথে বিয়ে দেয়া হয়। ছোট ছোট ছেলে মেয়েদের কাছে বেশ উপভোগ্য খেলা এটি। রান্না বান্না সংসার পরিচালনা সব কিছুই পুতুলের মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলা হয়। বাচ্চারা পরিবারে যা দেখে তাই পুতুলের মাধ্যমে অভিনয় করিয়ে বেশ আনন্দ পায়। 

মাটির তৈরি ছোট ছোট হাড়ি পাতিলে মিছে মিছে রান্না করে পরিবেশন করে। পুতুল খেলার সব চেয়ে মজার অংশ হল,  একজনের পুতুলের সাথে অন্য জনের পুতুলের বিয়ে দেয়া। 

২. টোপাভাতি/জুলাবাতি

পুতুল খেলার মতই মেয়েদের আরেকটি প্রিয় খেলা হচ্ছে টোপাভাতি/জুলাবাতি। তারা ছোট ছোট বাসনে রান্না করে।  বাড়ির আঙিনায় কঞ্চি দিয়ে ছোট ঘর বানায় তারা,  সেখানে ছোট ছোট মাটির চুলায় হাড়ি পাতিল বসিয়ে রান্নার অভিনয় করে। চুলা দিয়ে তারা লবণ ও চিনি বানায় বড় গাছের পাতাকে ব্যবহার করে বাসন হিসেবে। কেউ কেউ আশেপাশের ঝোপঝাড়ে বাজার করতে যায়।  কাল্পনিক ভাবে বাজার করে টাকার হিসেবে তারা ব্যবহার করে কাঁঠাল পাতা।

রান্না শেষে সবাই গোল হয়ে বসে খাবার পরিবেশ করে,  মুখ দিয়ে শব্দ করে বুঝায় যে তারা খাবার খাচ্ছে। দূর থেকে শুনা যায় তাদের সেই খেলা ঘর থেকে ক্ষণে ক্ষণে হাসি ভেসে আসার শব্দ।

৩. এক্কাদোক্কা/চাড়া

দুই বাংলাতে  মেয়েদের মধ্যে খুবই জনপ্রিয় একটি খেলা হচ্ছে এক্কাদোক্কা। ভাঙ্গা মাটির কলসি বা হাড়ির টুকরা দিয়ে ঘুটি বানিয়ে এক্কাদোক্কা খেলা হয়। খোলা জায়গা বা বাড়ির উঠানে দাগ কেটে আয়তকার একটি ঘর আকা হয় যেখানে ছয়টি খোপ থাকে।  এই খেলা একা বা বন্ধুদের নিয়েও খেলা যায়।  

ভাঙা হাড়ির টুকরা দিয়ে বানানো ঘুটি  এক এক করে প্রতিটি ঘরে ছুড়ে এবং এক পায়ে লাফ দিয়ে দিয়ে অন্য ঘরে নিয়ে যাওয়া হয়। আঙুল যদি ভুল করে কোন রেখায় পড়ে তাহলে খেলোয়াড় তার দান হারান। এভাবে যে সব ঘর পাড় করতে পারে সেই খেলায় জয়ী হয়।  

অঞ্চলভেদে এই খেলার নিয়মে কিছুটা পার্থক্য থাকলেও মুল বিষয়বস্তু একই। গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী অনেক খেলা হরিয়ে গেলেও এই খেলাটি এখনো হারিয়ে যায় নি। গ্রাম কিংবা মফস্বলে এখনো এই এক্কাদোক্কা খেলা দেখা যায়। 

৪.রুমাল চুরি

খেলোয়াড়েরা গোল হয়ে বসে রুমাল চুরি খেলে থাকে। প্রথমে একজনকে চোর বানানো হয়। বাকিরা বৃত্তের কেন্দ্রের দিকে মুখ করে বসে থাকে।  চোর একটি রুমাল নিয়ে বৃত্ত বরাবর ঘুরতে থাকে এবং একজন খেলোয়াড়ের পেছনে রুমাল রেখে দেয়। চোর যদি রুমাল রেখে এক চক্কর ঘুরে আসতে পারে আর যদি সে টের না পায় যে তার পেছনে রুমাল রাখা হয়েছে, তাহলে চোর এসে তাকে  কিল-চাপড় মারতে থাকে।  যদি খেলোয়াড় টের পেয়ে যায় তাহলে সে রুমাল নিয়ে উঠে দাঁড়ায় এবং তাকে কোন মার খেতে হয় না। 

নতুন যে উঠে দাড়ায় সে তখন চোর হয় এবং ফাকা জায়গায় আগের চোর বসে পড়ে। আর এভাবেই এই খেলা চলতে থাকে।  

৫. হাডুডু বা কাবাডি

এবার আমরা আলোচনা করব বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা হাডুডু বা কাবাডি নিয়ে। ১৯৭২ সালে এই খেলাটিকে বাংলাদেশের জাতীয় খেলা হিসেবে ঘোষণা করা হয়। দারুণ ব্যাপার হল গ্রাম বাংলার এই খেলাটিকে সাফ গেমসেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বাংলাদেশ বা বাঙালি তথা পুরো উপমহাদেশেও এই খেলাটি দারুণ জনপ্রিয়। 

খেলার নিয়ম কানুন কঠিন কিছু নয়  প্রত্যেক দলে ৮ থেকে ১০ জন করে খেলোয়াড় থাকে। দুটি দল পরস্পরের সাথে প্রতিযোগিতা করে। আয়তকার একটি কোর্টে এই খেলাটি পরিচালিত হয়। কোর্টটি দুই ভাগে ভাগ করা থাকে, দুইপাশে দুটি দল অবস্থান করে। খেলার নিয়ম হল যদি এক পক্ষের একজন দম নিয়ে অন্য পক্ষের একজনকে ছুঁয়ে নিজের কোর্টে চলে আসতে পারে তাহলে অপর পক্ষের ছুঁয়া পাওয়া ব্যক্তি দল থেকে বাদ পড়বে। যদি দম নিয়ে যাওয়া খেলোয়াড়কে অপর পক্ষ নিজেদের কোর্টে ধরে রেখে দিতে পারে তাহলে সে বাতিল হয়ে যাবে। আবার এক পক্ষ থেকে একজন বাদ পড়লে অন্য পক্ষের এজন্য খেলায় আবার যুক্ত হবে। এভাবে যে দলের খেলোয়াড় একেবারে ফুরিয়ে যাবে সেই দল হেঁড়ে যাবে।

বাংলাদেশে জাতীয় ভাবে প্রতিবছর কাবাডি প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ সরকার আন্ত:স্কুল প্রতিযোগিতায় এই খেলাটির অন্তর্ভুক্তি বাধ্যতামূলক করেছে।

গ্রাম বাংলায় এমন হাজারও খেলা রয়েছে যেগুলো মানুষকে যুগ যুগ ধরে বিনোদন যুগিয়ে আসছে। এই খেলা গুলোর চর্চা এখন আগের না হলেও এগুলো বাঙ্গালির ঐতিহ্যের সাথে জুড়ে রয়েছে শক্তপোক্ত ভাবে।

বাংলা চলচ্চিত্র ইতিহাস:

নির্বাক যুগ: ১৯১৯-১৯৩০ সম্পাদনা
হীরালাল সেন বাংলার অন্যতম সম্মানিত ব্যক্তি যিনি ভারতের প্রথম চলচ্চিত্র পরিচালক। তখনকার সব চলচ্চিত্রই ছিল নির্বাক।
প্রথম সবাক চলচ্চিত্র নির্মিত হয় ১৯৩০এর শুরুর দিকে। চলচ্চিত্রগুলো উর্দু কিংবা ফারসি ভাষায় নির্মিত হতো যাতে বড় বাজার ধরতে পারে। একটি ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি ছিল ইস্ট ইন্ডিয়া ফিল্ম কোম্পানি। প্রথম সবাক বাংলা চলচ্চিত্র হচ্ছে ‘জামাই ষষ্ঠী’ যেটি ১৯৩১ সনে নির্মিত হয়। প্রথম দিককার জনপ্রিয় অভিনেতা ছিলেন প্রমথেশ বড়ুয়া ও দেবকী বোস। প্রমথেশ বড়ুয়া চলচ্চিত্র পরিচালনা করে ইন্ডাস্ট্রিতে নতুন মাত্রা যোগ করেন। দেবকীও চলচ্চিত্র পরিচালনা করেন। তিনি ১৯৩২ সালে ‘চণ্ডীদাস’ নির্মাণ করেন। চলচ্চিত্রটি শব্দব্যবস্থার জন্য উল্লেখযোগ্য কারণ শব্দগ্রহণকারী মুকুল বোস ডায়লগ স্পেস আউট ও ফ্রিকুয়েন্সি মডুলেশন সমস্যার সমাধান করতে পেরেছিলেন।


১৯১৭-১৯২০ সালের চলচ্চিত্রসমূহ
১৯১৭
চলচ্চিত্রের নাম সত্যবাদী রাজা হরিশ্চন্দ্র পরিচালক রুস্তমজী ধোতিওয়ালা ভূমিকায় মিস সাওয়ারিয়া, মিস্টার হুরমুশজী তন্ত্র, মিস গহরজান, বেহরামশো নাটকীয়
১৯১৯
নাম বিল্বমঙ্গল পরিচালক রুস্তমজী ধোতিওয়ালা ভূমিকায় মিস কাইয়ুম মামাজীওয়ালা গহর
১৯২০
নাম মহাভারত পরিচালক রুস্তমজী ধোতিওয়ালা।

সবাক চলচ্চিত্রের উত্থান: ১৯৩১-১৯৪৭ সম্পাদনা
ভারতীয় চলচ্চিত্রে বাংলা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির ভূমিকা সুদূরপ্রসারী। পূর্ণদৈর্ঘ্য বাংলা ছবি ‘দেনা পাওনা’ ১৯৩১ সনের ৩০ ডিসেম্বর শুভমুক্তি পেয়ে কলকাতার চিত্রা সিনেমা হলে প্রথম প্রদর্শিত হয়।
স্বর্ণযুগ: ১৯৫২-১৯৭৫ সম্পাদনা ১৯৩১। নাম দেনা পাওনা (চলচ্চিত্র)। পরিচালক প্রেমাঙ্কুর আতর্থী ভূমিকায় দুর্গাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, অমর মল্লিক, জহর গঙ্গোপাধ্যায়, ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় (সিনিয়র), ভূমেন রায়, কুসুমকুমারী, নিভাননা দেবী, উমাশশী, শিশুবালা, অনুপমা দেবী, আভাবতী ।এটি একটি পারিবারিক চলচ্চিত্র এটিকে প্রথম বাংলা সবাক চলচ্চিত্র হিসেবে গণ্য করা হয়।প্রথম ভারতীয় সবাক চলচ্চিত্র আলম আরা মুক্তিপ্রাপ্তির বছরেই এই চলচ্চিত্রটি শুভমুক্তি লাভ করে। ২৪শে ডিসেম্বর, ১৯৩১এ কলকাতার চিত্রা (এখন মিত্রা) চলচ্চিত্র প্রেক্ষাগৃহে এটি মুক্তি পায়।


পশ্চিমবঙ্গের চলচ্চিত্র
বলতে কলকাতায় অবস্থিত টালিগঞ্জের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিভিত্তিক চলচ্চিত্রসমূহকে বোঝানো হয়। এটি টলিউড (ইংরেজি: Tollywood “টলিউড”) নামে পরিচিত। যদিও ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিটি বলিউড, তেলেগু ও তামিল ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি থেকে অনেক ছোট, তবু এটি সমান্তরাল ও আর্ট ফিল্ম নির্মাণ করে বিশ্বব্যাপী সমাদৃত হয়েছে। বিভিন্ন নির্মাতা ও অভিনেতা ভারতীয় জাতীয় ফিল্ম পুরস্কার সহ আন্তর্জাতিক পুরস্কারেও ভূষিত হয়েছেন। বর্তমানে টলিউড থেকে রোমান্টিক ও সামাজিক ছবিই বেশি নির্মিত হয়।
সত্যজিৎ রায়ের “পথের পাঁচালী(১৯৫৫)” ১৯৫৬ সালের কানস্ ফিল্ম ফেস্টিভালে বেস্ট হিউম্যান ডকুমেন্ট পুরস্কার লাভ করে।


বাংলায় চলচ্চিত্রের সূচনা ১৮৯০ সাল থেকে যখন কলকাতার থিয়েটারে বায়োস্কোপ দেখানো হতো। একদশকের মধ্যেই ইন্ডাস্ট্রির বীজবপন করেন হীরালাল সেন। তিনি রয়্যাল বায়োস্কোপ কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করে কলকাতার স্টার থিয়েটার, মিনার্ভা থিয়েটার, ক্লাসিক থিয়েটার ইত্যাদিতে জনপ্রিয় শো দেখাতেন। একটি লম্বা বিরতির পর হাল ধরেন ধীরেন্দ্রনাথ গাঙ্গুলি। তিনি ইন্দো-ব্রিটিশ ফিল্ম কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেন যা বাঙালি মালিকানার প্রথম কোম্পানি (১৯১৮)। প্রথম বাংলা ফিচার ফিল্ম ছিল বিল্বমঙ্গল যেটি ১৯১৯ সালে মদন থিয়েটারের ব্যানারে নির্মিত হয়।

“বিলাত ফেরত” ছিল আইবিএফসি’র প্রথম প্রযোজনা (১৯২১)। মদন থিয়েটারের জামাই ষষ্ঠী ছিল প্রথম স্বল্পদৈর্ঘ্য সবাক চলচ্চিত্র এবং প্রেমাঙ্কুর আতর্থী পরিচালিত দেনা পাওনা চলচ্চিত্রটি ছিল বাংলার প্রথম সবাক চলচ্চিত্র। তারপর অনেক ইতিহাস হলো, তারমধ্যে সত্যজিৎ রায়, মৃণাল সেন ও ঋত্বিক ঘটক এবং অন্যান্য নির্মাতারা তাদের স্থান সুপ্রতিষ্ঠিত করে বাংলা চলচ্চিত্রকে অনেকদূর অগ্রসর করেন।

বাংলাদেশের চলচ্চিত্র
বলতে অবিভক্ত বঙ্গ (১৯৪৭ পর্যন্ত) থেকে শুরু করে পূর্ব পাকিস্তান এবং ১৯৭১ সালের পর স্বাধীন বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পকে বোঝায়।

পৃথিবীর অনেক দেশের মত বাংলাদেশেও (তদানীন্তন পূর্ব বঙ্গ) ১৮৯০-এর দশকে চলচ্চিত্র প্রদর্শনী শুরু হয়েছিল। এই সূত্র ধরে এই অঞ্চলে ১৯০০-এর দশকে নির্বাক এবং ১৯৫০-এর দশকে সবাক চলচ্চিত্র নির্মাণ ও প্রদর্শন শুরু হয়। চলচ্চিত্রের উৎপত্তি ১৯১০-এর দশকে হলেও এখানে পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নিয়ে আগ্রহের সৃষ্টি হয়েছে ১৯৫০-এর দশকেই। এখানকার সাংস্কৃতিক পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে নিতেই চলচ্চিত্রের প্রায় ৫০ বছরের মত সময় লেগেছে। ১৯৯০-এর দশকে বাংলাদেশে প্রতি বছর গড়ে ৮০টির মত পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র মুক্তি পেত। আর ২০০৪ সালের হিসাব মতে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকাতে বছরে গড়ে প্রায় ১০০টির মত চলচ্চিত্র মুক্তি পায়।এ হিসেবে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পকে বেশ বড়ই বলা যায়, যদিও এশিয়ার চলচ্চিত্র শিল্পে তা অনেকটাই উপেক্ষিত।

বাংলাদেশ ভূখণ্ডের প্রথম বায়োস্কোপ প্রদর্শনী হয় কলকাতার ব্রেডফোর্ড বায়োস্কোপ কোম্পানির উদ্যোগে ১৮৯৮ সালের ৪ এপ্রিল তৎকালীন বাকেরগঞ্জ জেলার ভোলা মহকুমার (অধুনা ভোলা জেলা) এসডিওর (অধুনা ডিসি) বাংলোতে। ১৭ এপ্রিল বায়োস্কোপ প্রদর্শনী হয় ঢাকায় পাটুয়াটুলীর ক্রাউন থিয়েটারে। ক্রাউন থিয়েটারের অস্তিত্ব এখন আর নেই। এই বায়োস্কোপের ছোট ছোট বিচ্ছিন্ন চলচ্চিত্র ছিল। গবেষক অনুপম হায়াতের অনুসন্ধান থেকে জানা যায়, এই সব চলচ্চিত্রের মধ্যে ছিল মহারানী ভিক্টোরিয়ার জুবিলি মিছিল, গ্রিস ও তুরস্কের যুদ্ধ, তিনশত ফুট উঁচু থেকে প্রিন্সেস ডায়ানার লাফ, রাশিয়ার সম্রাট জারের অভিষেক, পাগলা নাপিতের ক্ষৌরকর্ম, সিংহ ও মাহুতের খেলা, ইংল্যান্ডের তুষারপাতে ক্রীড়া, ফ্রান্সের রাস্তাঘাট ও পাতাল রেলপথ ইত্যাদি। তখনও বায়োস্কোপের মাধ্যমে এই চলচ্চিত্র দেখার জন্য সাধারণ দর্শকের টিকেটের ব্যবস্থা ছিল। টিকেটের দাম ছিল আট আনা থেকে তিন টাকা।

ঢাকার পাটুয়াটুলী ছাড়াও জগন্নাথ কলেজ (বর্তমানে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়), ভিক্টোরিয়া পার্ক (বাহাদুর শাহ পার্ক), আহসান মঞ্জিল এবং ঢাকার বাইরে তৎকালীন মানিকগঞ্জ মহকুমার (অধুনা জেলা) বগজুরি গ্রামে, জয়দেবপুরে (অধুনা গাজীপুর জেলা) ভাওয়াল এস্টেটের রাজপ্রাসাদে , ফরিদপুর জেলার মাদারীপুর মহকুমার (অধুনা শরীয়তপুর জেলা) পালং-এ বায়োস্কোপ প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। রাজশাহী শহরের বোয়ালিয়া জমিদার শরৎকুমার রায়ের বাড়িতে বায়োস্কোপ দেখানো হয় ১৯০০ সালের ২৬ জানুয়ারি থেকে কয়েক দিন ধরে। স্থানভেদে টিকেটের দামের তারতম্য ছিল। রাজশাহী থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক হিন্দুরঞ্জিকা পত্রিকায় এ নিয়ে একটি প্রতিবেন প্রকাশিত হয়। ঢাকার আরমানিটোলার পাটের গুদাম থেকে নিয়মিতভাবে বায়োস্কোপ প্রদর্শনীর গৌরবের অভিযাত্রা সূচিত হয় ১৯১৩-১৪ সালে। পরে এখানেই নির্মিত হয় ঢাকায় বাংলাদেশের প্রথম সিনেমা হল পিকচার হাউজ, যা পরে শাবিস্তান হল নামে রূপান্তরিত হয়।

কলকাতায় যে বায়োস্কোপ কোম্পানি গঠিত হয়, তার মূল ভূমিকায় বাঙালিরা ছিল না। ঢাকা জেলার মানিকগঞ্জ মহকুমার (অধুনা জেলা) বগজুরী গ্রামের হীরালাল সেন (১৮৬৬-১৯১৭) প্রথম দ্য রয়েল বায়োস্কোপ কোম্পানি গঠন করে চলচ্চিত্র নির্মাণ ও প্রদর্শনী শুরু করেন। ১৮৯৮ সালে সালে প্রতিষ্ঠিত এই দ্য রয়েল বায়োস্কোপ কোম্পানিই বাঙালির প্রথম চলচ্চিত্র-প্রচেষ্টা। অবিভক্ত বাংলার প্রথম চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবেও হীরালাল সেনের নাম স্বীকৃত। বিভিন্ন স্থানে অভিনীত নাটকের খণ্ডিত অংশের চিত্রায়ণ করে ১৯০১ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি কলকাতার ক্ল্যাসিক থিয়েটারে প্রদর্শন করেন। সেই সময়ের সীতারাম, আলীবাবা, দোললীলা, ভ্রমর, হরিরাজ বুদ্ধ প্রভৃতি জনপ্রিয় নাটক পরিবেশনার গুরুত্বপূর্ণ বিশেষ বিশেষ অংশ ক্যামেরায় ধারণ ও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের কাছে প্রদর্শন করে তিনি বাঙালির চলচ্চিত্র নির্মাণের ক্ষেত্রে প্রবল সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেন। প্রামাণ্যচিত্র, বিজ্ঞাপনচিত্র এবং সংবাদচিত্র নির্মাণের পথিকৃৎ হিসেবেও হীরালাল সেন ব্যক্তিত্ব।