Kaspersky APAC

বাঙালি জাতি তার হৃদয়ে মননে সব সময় তার ইতিহাস ঐতিহ্য ও কৃষ্টিকে লালন করে। জীবন ধারায় বাঙালিয়ানা সহ বাঙালিরা গৃহ সজ্জাতেও ধরতে রাখতে চায় বাঙালির ঐতিহ্য। বাঙালি  জাতিসত্তা প্রতিটা বাঙালি পরিচয়ের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। আমাদের দেশীয় বৈশিষ্ট্যগুলি প্রায়শই কোন না কোন ভাবে আমাদের দৈনন্দিন জীবনে প্রতিফলিত হয়।  

গৃহসজ্জাতেও কিভাবে বাঙালির সমৃদ্ধ ইতিহাস এবং সংস্কৃতির ছোঁয়া ধরে রাখা যায় সেটা নিয়েই আজকের এই আর্টিকেল। 

ঘরে নিয়ে আসুন দোলনা

বাঙালি ঐতিহ্যের অন্যতম একটি উপাদান হল দোনলা। গ্রাম বাংলায় বাড়ির আঙিনায় শোভা পায় এই দোনলা। হোক গরম বা বসন্ত বাঙালীরা গা এলিয়ে দিয়ে শান্তিতে চোখে বুজতে চায়।  আপনার ঘরের সাজ সজ্জাতেও দোলনা যুক্ত করতে পারেন। ঘরের একটি ফাকা জায়গায় ঝুলিয়ে দিতে পারেন একটি দোলনা। এতে একই সাথে ঘরের সৌন্দর্য যেমন বৃদ্ধি পাবে এবং আপনার আরামেরও ব্যবস্থা হবে। দোনলার পাশে একটি বুক সেলফ রাখতে পারেন অবসর সময়ে পড়তে পাড়েন গল্পের বই, উপন্যাস বা কবিতা।

দেয়ালে নকশী কাঁথা

ঐতিহ্যবাহী কোন শিল্পকর্ম বাড়ির দেয়ালে ঝুলিয়ে আপনি সহজেই বাসায় দেশীয় ছোঁয়া আনতে পারেন। শিল্পকর্ম ফ্রেমে বসিয়ে দেয়ালে ঝুলিয়ে আপনার জাতিসত্তার প্রকাশ করতে পারেন। যেকোনো শিল্প কর্ম হতে পারে তবে এই শিল্প কর্ম যদি হয় নকশী কাঁথা তাহলে তো কথাই নেই।

রঙ বেরঙের সুতা দিয়ে হাতের তৈরি কাঁথা একই সাথে আপনাকে যেমন শিল্পের ছোঁয়া দেবে তেমনি এতে আপনার ঘরে বাঙালিয়ানা ফুটে উঠবে।

দেশীয় কাপড়ের ব্যবহার

কিছু কিছু কাপড়ের সাথে বাঙালির দীর্ঘ ইতিহাস ঐতিহ্য জড়িত।  নির্দিষ্ট কিছু অঞ্চলে কিছু কাপড়ের বেশ সুনাম রয়েছে। যেমন  টাঙ্গাইলের ঐতিহ্য জামদানি, রাজশাহী পরিচিত তার সিল্কের জন্য এছাড়াও বাঙালির কিছু দেশীয় কাপড় রয়েছে যেমন,  খাদি, মসলিন, পাটের কাপড়। ঘর সজ্জায় আপনি বিশেষ এই কাপড় গুলো ব্যবহার করতে পারেন। যেমন সিল্কের বালিশের কাভার, মসলিনের পর্দা। ঘরে এগুলো ব্যবহার একদিক থেকে যেমন আরাম দায়ক অন্যদিকে এগুলো ঘরের সৌন্দর্য বাড়িয়ে তুলবে।  

গৃহ সজ্জায় বাঙালিয়ানা ধরে রাখতে আপনি দেশীয় সামগ্রী ব্যবহার করতে পারেন এতে করে আপনি যেমন আপনার শেকড় কে ধরে রাখতে পারবেন তেমনি আপনার পরবর্তী প্রজন্মকেও বাঙালি চেতনায় উদ্ভুদ্ধ করতে পারবেন।

বাংলার লোকশিল্পের নানা উপাদানে ঘর কে সাজানো যায়:
লোকশিল্পের উপাদান দিয়ে ঘর সাজানোর চল নতুন নয়। আগেও বাঙালিয়ানার অঙ্গ হিসেবে ঘু্র্ণির মাটির পুতুল বা শীতলপাটি থাকতই। সহজেই ফিরিয়ে আনা যায় সেই ঐতিহ্য। খুব অল্প খরচে উৎসবের সময়ে আপনার প্রিয় ঘরটি হয়ে উঠতে পারে ষোলো আনা বাঙালিয়ানার প্রতীক।

ঘর সাজাতে ভালবাসেন সবাই। রুচির ফেরে এক এক জনের অন্দর হয়ে ওঠে এক একটা স্বতন্ত্র ভুবন। স্থপতিরা তো বলেই থাকেন আপনার অন্দরই আপনার ব্যক্তিত্বের দর্পণ। কিন্তু অনেকেই এই ঝকমারি এড়াতে চান। খরচের ভয় পান। তবে বুদ্ধি থাকলে আর চেনাজানার পরিধি বাড়লে, সস্তায় ঘর সাজানো খুব কঠিন কাজ নয়। আপামর বাংলার গ্রাম উঠে আসতে পারে আপনার ড্রয়িং রুমে।

কিন্তু কোথায় কোন জিনিস বিখ্যাত, কোন অঞ্চলের কোন কোন বিশেষত্ব দিয়ে সাজাবেন ঘর, এ চিন্তাও মনে ভিড় করে আসে বইকি। সহজে মিলবে, পকেটসই এমনই কিছু ঘর সাজানোর উপাদানের হদিশ রইল।

পিংলার পট: ঘরের দেওয়াল পটচিত্র বা ঘরের কোনায় পটের যেকোনো কিছু দিয়ে সাজানো একটা আলাদা সৌন্দর্য্য। দিনের দিন ঘুরে চলে আসা যায় পিংলা। সেখানে নতুনগ্রামের পট বিক্রেতাদের সঙ্গে মোলাকাত সত্যি এক অনবদ্য অভিজ্ঞতা হতে পারে। সস্তা দরে কিছু জড়ানো পটও কিনে আনতে পারেন।

কৃষ্ণনগরের মাটির পুতুল: শোকেস বা ঘরের কোণের শেল্‌ফটি সেজে উঠুক ঘুর্ণির মাটির পুতুলে। কৃষ্ণনগর থেকে ঘুর্ণির দূরত্ব এমন কিছু নয়। ঘোরাও হবে আবার পুতুল কিনে ফেরাও যাবে যদি হাতে একটু সময় লাগে। পুতুল পাবেন ১০০ টাকারও কম দামে।

নতুনগ্রামের পেঁচা: শহরের শীতকালীন মেলায় আসে নতুনগ্রামের প্যাঁচা। অগ্রদ্বীপের এই নতুনগ্রাম অঞ্চলের অধিবাসীরা কয়েক শতক ধরে বংশ পরম্পরায় নিমকাঠ চিড়ে এই প্যাঁচা বানিয়ে আসছন। শো পিস হিসাবে এদের জুড়ি নেই। ইদানীং মূল মোটিফটাকে রেখে নানা আসবাবও বানান নতুনগ্রামের শিল্লীরা। ব্যবহার করা যেতে পারে সেই আসবাবও। মেলাগুলিতে দরদাম করে কিনতে পারেন। তবে নিজে গিয়ে কিনলে বেশি ভাল।

বাঘমুন্ডির ছৌ নাচের মুখোশ: পুরুলিয়ার বাঘমুন্ডি অঞ্চলের চরিদা গ্রামে কয়েক ঘর মুখোশশিল্পী বাস করেন। অনুপম দক্ষতায় তাঁরা তৈরি করেন নানা ধরনের মুখোশ। প্রতিটি মুখোশের অভিব্যক্তি আলাদা। তিনশো টাকা থেকে পাঁচ হাজার টাকা দামের মধ্যে নানা আকারের মুখোশ পাওয়া যায় শিল্পীদের ঘরগুলিতে। সরকারি মেলায় স্টলও দেন মুখোশশিল্পীরা। আপনার দেওয়াল সেজে উঠতে পারে একটি জমকালো মুখোশে।

বাঁকুড়ার ডোকরা: ডোকরা বাঁকুড়ার গর্ব। বাঁকুড়ার বিকনা গ্রামে ব্রোঞ্জ কাস্টিং করে নানা ডোকরার মূর্তি বানানো কয়েক শতক ধরে চলে আসছে। কর্মকারদের এই অনন্য সৃস্টি আপনার বাড়ির যে কোনও কোণে রাখলে তাতে আলাদা করে সকলের চোখ পড়তে বাধ্য।
বাঁকুড়ার পোঁড়ামাটির ঘোড়া:
বাঁকুড়ার পোঁড়ামাটির ঘোড়া পৃথিবী বিখ্যাত।বাংলার অন্যতম লোকশিল্প। ঘোড়াগুলো ছোটো বড়ো ভিন্নও আকারের হতে পারে।ঘরের যেখানেই রাখা হোক না কেনো, এর অদ্ভুত বৈশিষ্ট্যের জন্য চোখে পড়বেই।

আরও কিছু ছোটখাটো জিনিসও সংগ্রহ করতে পারেন। পড়ার ঘরে টেবিলের এক কোণে বর্ধমানের তালপাতার সেপাই স্থান পেতে পারে। কার্পেটের বিকল্প হিসেবে জায়গা দিন শীতলপাটিকে। ঘরে ঝুলতে পারে তালপাতার পাখাও। কাঁসা পিতলের থালা উৎসবের দিনগুলিতে ব্যবহার হোক। লোডশেডিং হোক বা না হোক দেওয়াল সাজাতেই সহায় হতে পারে হ্যারিকেন। তোয়ালের জায়গা অনায়াসে দখল করতে পারে শান্তিপুরী গামছা।

ডিজিটাল যুগে মিশ্র সংস্কৃতির দাপটকে পাল্লা দিতে ঘর থেকেই শুরু করুন যুদ্ধটা। লোকশিল্পীদেরও খানিক বিত্রিবাটা বাড়বে, আপনার নিজের ঘরটাও হয়ে উঠবে পাঁচ জনের থেকে আলাদা।